Friday, September 19, 2008

অগ্নি পরীক্ষায় ওবামার ‘চেঞ্জ’

বুশের উত্তরসূরী রিপাবলিকান প্রার্থী জন ম্যাককেইন (৭২) তাঁর দলের কনভেনশনে বলছিলেন, ‘আমেরিকানরা এক দল অন্য দলের বিরুদ্ধে আর বিষোদগার দেখতে চায় না। আমি দুই দলের সদস্যদের সাথেই কাজ করেছি। আমাদের সমস্যাটা কোথায় তা আমি জানি। আর এও জানি নিরপেক্ষভাবে দলের উর্ধ্বে ঊঠে কিভাবে এর সমাধান করতে হয়। আসুন, আমরা দুই দলের মধ্যকার ভাল ভাল ধারনাগুলো কাজে লাগাই। আমরা সবাই এক খোদার বান্দা, সবাই আমেরিকান। এই আমেরিকানদের জন্যই আমি যুদ্ধ করেছি। আর এবার আমি ঠিক আপনার জন্যই লড়ছি’। তিনি আমেরিকানদের তাঁর নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি যাচাইয়ের আহবান জানিয়ে যখন আরো বললেন, ‘আমরা নির্বাচিত হয়ে ওয়াশিংটনে পরিবর্তন আনব আর ওয়াশিংটনকেও সুযোগ দিব আমাদেরকে বদলাতে। দেশ চালাতে ভবিষ্যত ক্যাবিনেটে আমি ডেমোক্রেটদেরও অন্তর্ভূক্ত করব’। তখন আমি ভাবছিলাম আমাদের দেশের রাজনীতিকদের মিডিয়াতে হরহামেশা বোমা ফাটানো দায়িত্বহীন কথাবার্তা। এরকম একজনও জীবিত রাজনীতিবিদ পাওয়া গেলনা যিনি কিনা দেশের সব মানুষকে স্বনির্ভর বাংলা গড়ার সুরের মূর্চ্ছনায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখাবেন। আমেরিকার দুই দলের নামকরা মোটামুটি সব প্রেসিডেন্টেরই অতীত ঘাঁটলে দেখা যাবে তাঁদের মেয়াদে কোন না কোন বড়সড় কেলেংকারীর ছাপ রেখে গেছেন। বুশের তো কেলেংকারীর অন্তই নেই। তাঁর বাবারও ছিল। ক্লিনটন, রিগ্যান সবারই ছিল। কিন্তু নির্বাচন এলে তাঁরা শুধুমাত্র ঠিক আগের প্রেসিডেন্ট টার্ম ছাড়া খুব বেশী দূর যেয়ে অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘঁটি করেন না। বর্তমান ও সামনের অনাগত দিনের পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বর্তমান প্রজন্ম কি রেখে যেতে পারে তার কথা শোনায়। ব্যারাক ওবামা (৪৭) তাঁর স্বাস্থ্যসেবা, ট্যাক্স হ্রাস, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য সহজল্ভ্য শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকুরি নিশ্চিত করণসহ প্রভূত নির্বাচনী ওয়াদার ফিরিস্তি তুলে ধরে বলেন, ‘প্রত্যকে প্রজন্মের মানুষদেরই দায়িত্ব রয়েছে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়া। বুশের বিধ্বস্ত ও ধ্বংসাত্মক নীতিতে জাতি বিভক্ত হওয়ায় আমি চাই সব আমেরিকানদের একসাথে নিয়ে চলতে। কারন, আমি দেশকে বড্ড বেশী ভালবাসি’।

যাহোক, আমরা আজকে আমেরিকার সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়ানো নিয়েই আমাদের আলোচনা বৃত্তাবদ্ধ করে রাখব।

বিশ্বব্যাপী বর্তমান ভাঙা ভাবমূর্তি মেরামতে নিজেকেই সবচেয়ে বেশী যোগ্য কারিগর প্রমান করতে ওবামা-ম্যাককেইন বাগযুদ্ধ এখন তুঙ্গে। জন ম্যাককেইন রিপাবলিকান দলের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন লাভের পর অর্থ যোগানদাতাদের নিকট ই-মেইলে জানিয়ে দেন তিনি সারাহ পলিনকে ‘ওয়াশিংটন সংস্কার’-র জন্য রানিংমেট হিসেবে বাছাই করেছেন। অর্থাৎ এর মাধ্যমে তিনিও স্বীকার করে নিলেন আট বছর বুশ অফিস করায় ‘ওভাল অফিস’কে এখন ‘রিফর্ম’ করতে হবে। তিনি তাঁর নিজ দলের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘কিছু রিপাবলিকানরা দূর্নীতি উৎসাহিত করায় আজ আমরা আমেরিকানদের বিশ্বাস নষ্ট করেছি।’ আমেরিকার অংগরাজ্য মিনোসোটার সেন্ট পল এনার্জি সেন্টারে দলের কনভেনশনে ম্যাককেইন আলাস্কার গভর্ণর ১৯৮৪ সালের সাবেক রানারস্‌ আপ মিস আলাস্কা সারাহ পলিনের (৪৪) নাম ঘোষনা করেন। সারাহ তাঁর দীর্ঘ অনলবর্ষী বক্তৃতায় নিজের পরিচয় ‘হকি মাতা’ বলে ওবামার বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষন দিয়ে রিপাবলিকানদের ভীষন উত্তেজিত ও উৎফুল্লিত করেছেন। ডায়াসে তিনি স্বামী টড পলিন ও পাঁচ সন্তান নিয়ে হাজির হন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তান ডাউন সিনড্রোম ছেলে ট্রিডের বয়স মাত্র পাঁচ মাস। সাধারনভাবে আমেরিকায় পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত নাজুক হলেও শাসকদের ক্ষেত্রে আমেরিকানরা উলটো দেখতে চায়। প্রার্থীরা তাই পরিবার-পরিজনদের সাথে করে স্টেজে উঠে শক্ত পারিবারিক বন্ধন প্রদর্শনের প্রথম অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে হয়। সারাহ বললেন, ‘তাদের সংসার দু’যুগের বেশী সময় ধরে আজো অভঙ্গুর’। সন্তানদের মধ্যে ১৭ বছর বয়স্কা ব্রিস্টল পাঁচ মাসের অন্তঃস্বত্বা। বন্ধু ও হবু স্বামী সমবয়সের লেভী জনস্টনও উপস্থিত ছিল। গর্ভপাতবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী সারাহ তার কুমারী মেয়ের পেটের বাচ্চা নষ্ট না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই আন্দোলনকে আরো বেগবান করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। রিলেজিয়াস কমিউনিটির ব্যক্তিত্বরা এতে বাহ্‌বা দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে পলিন এতগুলো সন্তান লালন-পালন ও সংসার সামলানোকে তাঁরা ‘অসাধারন’ বলে অভিহিত করেছেন।
সবাইকে চমকে দিলেও রিপাবলিকানরা মনে করছেন, ম্যাককেইন রানিং মেট নির্বাচনে ভুল করেননি। পলিনকে মনোনয়ন করার মূল কারনসমূহের একটি হল ‘জেন্ডার কার্ড’। হিলারীর ১৮ মিলিয়ন ভোট বাগানোর মোক্ষম হাতিয়ার একমাত্র সারাহ্‌ই। বাছাই পর্বে ওবামাকে হারাতে হিলারী খুব নোংরা ও ব্যক্তিগত আক্রমন করে এড দিয়েছিলেন। হিলারী সর্বশক্তি দিয়ে ওবামাকে এখন সমর্থন করলেও তাঁর ব্যবহৃত পূর্বের কৌশলগুলো বুমেরাং হয়ে ওবামাকে বারে বারে আঘাত করছে। হিলারীর পূর্বের ওই টেপ বাজিয়ে নেপথ্যের কন্ঠ বলছে, ‘হ্যাঁ, হিলারী সঠিকই বলেছেন’। হিলারীর ওই বিজ্ঞাপনটির সারমর্ম ছিল এরূপ, ভোর তিনটায় ওয়াশিংটন হাউসে ফোন এলে ওবামার সাহস নেই ফোন ধরার। কারন তিনি ‘অপরিপক্ক’, একমাত্র হিলারীই পারবেন অসময়ে উদ্ভূত যেকোন পরিস্থিতি সামাল দিতে। স্বামী বিল ক্লিনটনসহ তিনি তাঁদের গোঁড়া সমর্থক বিশেষকরে মহিলা ভোটারদের ওবামার পক্ষে ভোট দেয়ার প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হিলারী বলছেন, ‘এই ২০০৮ সালেও ম্যাককেইন মনে করেন না যে, পুরুষ ও মহিলাদের বেতনে বৈষম্য থাকা বাঞ্চনীয় নয়’।

প্রতিপক্ষের এরকম অপবাদ আগেভাগে আঁচ করেই ওবামা তাঁর রানিংমেট হিসেবে ৬৬ বছর বয়স্ক জো বাইডেনকে পছন্দ করেছিলেন। বাইডেন ৬ মেয়াদ ধরে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে আসছেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। আমেরিকার ‘ফরেন রিলেশন কমিটির’ চেয়ারম্যান ছাড়া ‘ইয়ুগোশ্লাভ যুদ্ধ’, ‘ইরাক যুদ্ধ’-র রেজুলেশন তৈরীতেও তাঁর প্রধান ভূমিকা রয়েছে। ‘সিনেট জুডিসিয়ারী কমিটি’, ‘ড্রাগ পলিসি’, ‘অপরাধ প্রতিরোধ’, ‘নাগরিক অধিকার আন্দোলন’, ‘ভায়োল্যান্টক্রাইম কন্ট্রোল এন্ড ল এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট’, ‘ভায়োলেন্ট এগেইনস্ট উইমেন অ্যাক্ট’ ইত্যাদির সাথে তাঁর জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

জো বাইডেনের বিপরীতে পলিনকে রক্ষনশীল দল রিপাবলিকান-কৌশলীদের পছন্দ করার আরো একটি কারন রয়েছে। সেটি হল সারাহ্‌র কট্টর ধার্মিক ইমেজ। যিনি ইরাক যুদ্ধকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ মনে করেন, এতে করে আনূমানিক ৮৭ মিলিয়ন ক্যাথলিকদের ‘সুইং ভোট’ ঝুঁকে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। গত জুনে পলিন তাঁর সাবেক গীর্জার বাইবেল ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায় ইরাকে আমেরিকান সৈন্য মোতায়েন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘Our national leaders are sending them out on a task that is from God (অর্থাৎ আমাদের নেতৃবৃন্দ ঈশ্বর অর্পিত কর্ম সম্পন্ন করতেই ইরাকে সৈন্য পাঠিয়েছেন।‘) তিনি আরো বলেছেন, ‘That’s what we have to make sure that we’re praying for , that there is plan and that plan is God’s plan (অর্থাৎ এই কারনেই আমাদেরকে অবশ্যই তাদের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। আর সেখানে একটা পরিকল্পনাও রয়েছে এবং সেই পরিকল্পনাটা হল ঈশ্বরের পরিকল্পনা।‘) পলিনের বিশেষ এই ভাষনটি তাঁর নিজ শহর ওয়াসিলার ‘ওয়াসিলা এসেম্বলী অব গড’ সাইটে দেখানো হয়। তিনি ছাত্রদেরকে নিজেকে ‘বাইবেল বিলিভিং’ পরিচয় দিয়ে আরো বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে এই বুঝাতে চাই যে, তোমরা যীশুর ভালবাসা আলাস্কার সর্বত্র ছড়িয়ে দাও। আমি গভর্ণর অফিসে বসে যীশুর ইচ্ছারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টিত। রাজ্যের ৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপ লাইনের প্রজেক্ট বাস্তবায়নের চেষ্টাও ঈশ্বরের ইচ্ছায়। আমার স্টাফরা কখনো কোন ভাল কাজ করতে পারত না যদি না আলাস্কাবাসীদের হৃদয়-মন ঈশ্বরের সাথে মিশে না থাকত’। তিনি আরো বলেন, ‘I think God’s will has to be done in unifying people and companies to get that gas line built.’
ম্যাককেইনের ‘ভেরী এগ্রেসিভ’ প্রচারনার বিপরীতে ওবামাও খুব খাটছেন ক্যাথলিকদের মন পাওয়ার। ম্যাককেইনের সমর্থকরা ওবামাকে দোষছেন ‘দ্যা এবোরশেন প্রেসিডেন্ট’ বলে। কারন ওবামা গর্ভপাত ও সমকামী অধিকার আন্দোলনের পক্ষে। অবশ্য ওবামাশিবির যুক্তি দেখাচ্ছে, ‘অর্থনীতি’, ‘পরিবেশ’ ও ‘দারিদ্র্য’ মোকাবেলায় তারা যে নীতি গ্রহন করেছে তা বাস্তবায়িত হলে ক্যাথলিকদের দাবী অনুযায়ী রিপাবলিকানদের চেয়েও গর্ভপাত হ্রাস পাবে।
ওবামার প্রচারণা-গোষ্ঠী ক্যাথলিকদের বিশেষ টার্গেট নিয়ে ‘ইয়ং ক্যাথলিক’, ‘সোশ্যাল জাস্টিস ক্যাথলিক’ ও ‘উইমেন রিলিজেয়াস কমিউনিটি’ ভাগ করে তাদের পেছনে কাজ করছে। রিগ্যান প্রশাসনের সাবেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ ডগলাস কমিক প্রণীত ওবামাকে নিয়ে লেখা “Can a Catholic Support Him” বইটিকে তারা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে।

যাহোক, ওবামার সাড়া জাগানো ভাবমূর্তি মোকাবেলায় জেন্টেলম্যান ম্যাককেইন বেশ সংযত, মিতভাষী। বেশ সম্মানজনক পথ তিনি বেছে নিয়েছেন। এ পর্যন্ত মাত্র ছয়বার সরাসরি ‘ওবামা’ নাম ধরে কথা বলেছেন। তিনি তাঁকে ‘অপরিপক্ক’ ও ‘দেশের চেয়ে নিজের ক্যারিয়ার নিয়েই ব্যস্ত’ বলে মনে করেন। ওবামা কিন্তু এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছেন। তিনি কথাবার্তায় ম্যাককেইনের নাম অসংখ্যবার উচ্চারন করছেন। বলছেন, ‘I’ve got news for you, John McCain. We all put our country first.’ এই “Country First” ই হল এবারের জন ম্যাককেইনের মূল শ্লোগান। ওদিকে ম্যাককেইন শিবিরও ‘Change’ শব্দের দিকে আঙুল তুলে কথা বলছে। ওবামার জনপ্রিয় শ্লোগান ‘চেঞ্জ’-র সার্থক রূপায়ক একমাত্র ম্যাককেইনই অভিহিত করে রিপাবলিকান কৌশলী স্টিভ শমিড (Steve Schmidt) বলেছেন, ‘John McCain has a record of fighting to change.’ ওবামার শ্লোগানটি এভাবে হাত বদল হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। কারন ভোটের শেষ মুহুর্তে রিপাবলিকানদের ‘ডার্টি গেম’-র নজির আমেরিকানদের কাছে রয়েছে। গেল বারের নির্বাচনে জন কেরীর ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘ইরাক ইস্যু’ বেশ জনপ্রিয় লাভ করায় বুশ দেশের ‘নিরাপত্তা’কেই মূল ইস্যু বানিয়ে আমেরিকানদের উত্তেজিত করে ফলাফল পালটে দেন।
পলিনের বাকপটুতা ও জেদী ইমেজ এখন আমেরিকার রাজনীতিতে আলোচ্য বিষয়। মাত্র দশ হাজার লোকের শহর ওয়াসিলার একসময়ের মেয়র এই পলিনকে আগে মূল রাজনীতিতে পরিচিতি না থাকায় সাংবাদিকরা জ্বালায়নি। এখন চটকদার নিউজ পরিবেশন করতে মিডিয়াকর্মীরা তাঁর নথিপত্র ঘাঁটা শুরু করে দিয়েছে। নিজের বোনকে তালাক দেয়ার অপরাধে পলিন তাঁর পুলিশ অফিসার সাবেক বোনজামাইকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করার অনুরোধ করেছিলেন পুলিশের উর্ধতন এক কর্মকর্তাকে। তাঁর এই অন্যায় অনুরোধ আমলে না দেয়ায় খোদ ওই পুলিশ কর্মকর্তাকেই পলিন ডিসমিস করেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে। সরকারী কোষাগার তছরুপের অভিযোগও চলে এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ‘সরকারী সফর’ তিনি দেখিয়ে ৪৩,৮৯০ ডলারের ট্যাক্স রিসিট জমা দিয়েছেন। অথচ পলিনের এই সফরসমূহ ছিল স্বামী ও সন্তানসহ তাঁর ওয়াসিলার নিজ বাড়ীতে ৩১২ রাত কাটানো। মাত্র ঊনিশ মাসের গভর্ণরশীপে ১৭ হাজার ডলার নিয়েছেন ৬০০ মাইল দূরে ‘ডিউটি স্টেশন’ দেখিয়ে সরকারী অফিস করার। পলিন অবশ্য এর উত্তরে বলেছেন, আগের গভর্ণর ফ্র্যাঙ্ক মুরকাওস্কির চেয়ে তিনি অনেক কম খরচ করেছেন। তাঁর মুখপাত্র বলেছেন, ‘এটা তো চাকরিরই অংশ। ভ্রমনের জন্য তিনি এসব করতেই পারেন’।
সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ওবামা পলিনের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে নাক গলাতে মোটেই পছন্দ করছেন না। তিনি বলছেন, ‘আমরা কারো পরিবারের পিছনে লাগি না। তাদেরকে নিয়ে রাজনীতিও করতে চাইনা। এটা সঠিক ও প্রাসঙ্গিকও নয়। আমার লোকজনের কেউ এতে জড়াচ্ছে না, জড়ালে অবশ্যই তাকে ফায়ার করব’। তিনি বলছেন, ‘এগুলোকে আমাদের রাজনীতির অংশ বানানো উচিত নয়। পলিনের গভর্ণরের দায়িত্ব পালনে এবং আগামীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মদক্ষতা প্রদর্শনে যোগ্যতার মাপকাঠি ওইসব হতে পারেনা। সবাইকে অনুরোধ করব এই ধরনের গল্প ফাঁদা থেকে দূরে থাকতে’। ম্যাককেইন দল কিন্তু ওবামাকে অগ্রিম দূষছেন পলিনের দূর্বল দিকগুলোতে ঘায়েল করার অভিযোগে।
রিপাবলিকানদের নিন্দনীয় প্রচারণা ওবামা-বাইডেনকে সার্বক্ষনিক তটস্থ করে রেখেছে। ইন্টারনেটে পলিনের লোকজন সম্প্রতি একটা এড ছড়িয়েছে। এডটা হল এরকম, পলিনকে নিয়ে ওবামা কথা বলছেন। এমন সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনি কি নেতৃত্বের আসনে বসতে প্রস্তুত’? ওবামা বলছেন, ‘না’। আবার প্রশ্ন করা হলো, ‘বাজে কথা ছড়াতে কি আপনি রেডী’? ওবামার উত্তরঃ ‘হ্যাঁ’। বিভিন্ন রাজ্যে ছড়ানো আরো একটা ক্যাম্পেইনিং হল, ‘হোয়াইট হাউস’ মানেই হল ‘সাদাদের স্থান’, সুতরাং সেখানেই কৃষ্ণাঙ্গের না যাওয়াই হল আমেরিকান ট্র্যাডিশন ।
ওবামাকে এরকম বহু আক্রমন মোকাবেলায় ক্ষুব্ধ হয়ে রিপাবলিকানদের আরো একটি নোংরামী ‘লিপস্টিক অন অ্যা পিগ’ ক্যাম্পেইন বন্ধে দাবী জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘আমাকে যা খুশী বল তাতে আমার মাথা-ব্যাথা নাই, কিন্তু তাই বলে কাউকে নোংরা ও ব্যক্তিগত আক্রমন করতে পারবা না’। ‘লিপস্টিক অন অ্যা পিগ’ হল, পিগ (শুয়োর)-এর শরীর রং দিয়ে ভরে দিলেও সে পিগই। পলিন কৌতুক করে বলেছিলেন, আমেরিকান ষাঁড়ের সাথে ‘হকি মাতার’ অর্থাৎ তাঁর পার্থক্যটা হল ‘লিপস্টিক’। ওবামাকে বিদ্রুপ করে বুশ বলেছেন, ‘একটা পুরোনো মরা মাছকে যদি তুমি ‘চেঞ্জ’ নামের কাগজ দিয়ে পেঁচিয়ে রাখো, আট বছর পর এথেকে দূর্গন্ধই ছড়াবে’। এদের এগ্রেসিভ প্রচারনায় ওবামা ক্যাম্পেইন ভীত হয়ে পড়েছে। তারাও একটু একটু করে এই লাইনে পা বাড়াচ্ছে। ম্যাককেইনের কম্পিউটার জ্ঞান না থাকা নিয়ে ‘৮২ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী’ বলে বিদ্রুপ করে এরাও ইন্টারনেটে এড দিয়েছে।
গত ২৮ আগস্ট ডেনভারে ঐতিহাসিক ভাষন দেয়ার পর ওবামা র জনপ্রিয়তা ম্যাককেইনের চেয়ে আট পয়েন্টে এগিয়ে ছিল। শুরুতে ওবামার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় ডেমোক্রেটরা মোটামুটিভাবে এবারকার নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয় ধরে নিয়েই এগুচ্ছিল। কিন্তু পলিনকে মনোনয়ন দেয়ার পর এখন ওবামা কৌশলীদের আগের সব হিসাব-নিকাশ পালটে যেতে বসেছে। বাগ্মী পলিনের প্রথম আক্রমনেই ম্যাককেইন ৪ পয়েন্টে এগিয়ে ওবামা ক্যাম্পেইনে বাজীমাত করে দেন। জো বাইডেন এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন সামনের দিনগুলোতে সামনা-সামনি ডিবেটে কিভাবে এই বিদূষী মহিলাকে রুখা যায়। ‘ওয়ান অন ওয়ান’ ডিবেটে ম্যাককেইনকে মোকাবেলায় ওবামা খুব সহজে পার পেয়ে যাবার আশা করা গেলেও বাইডেনের ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। আর সেখানেই হয়ে যেতে পারে নাটকীয় কোন কিছু, যদিও সারা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষেরা বুশের আদর্শের বিপরীত মেরুর ওবামার দিকে তাকিয়ে আছে সেদেশে সত্যিকার ‘পরিবর্তন’-এর রূপ দেখবার।

Tuesday, September 9, 2008

সুরক্ষা স্বাধীনতা এবং সীমান্তে ‘পাখির ছানা’

খুব সন্তর্পণে বাংলাদেশে আরো একটা কাজ হয়ে গেল! পরিবর্তনের পাগলা হাওয়ায় পর্দার অন্তরালে কত অসাধ্য কাজ সাধন হওয়ার মত এটিও আমজনতার চোখের আড়ালেই থেকে গেল। অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়ের সাথে বাঘা শক্তি-পরাশক্তিসমূহ জড়িত বলে হয়তো প্রিন্ট ও স্ক্রীন মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে বেশী কথা বলতেও সাহস পায়নি। বাংলাদেশকে সম্পূর্ন অন্ধকারে রেখে বাংলাদেশেরই সীমান্ত সার্ভে করে ফেলছে আমেরিকা যুক্তরাস্ট্র। গত ১৩ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি সংস্থার প্রতিনিধিরা এ নিরাপত্তা সার্ভেতে অংশ নেন। সার্ভে চলে ২৮ জুন পর্যন্ত। তবে কেন এই সার্ভে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার হয়নি বাংলাদেশের কাছে। সার্ভে টিম যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার সময় মৌখিকভাবে বলে গেছে তারা সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে জানতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চিঠি দেয়া হবে (সূত্রঃ নয়াদিগন্ত, ১২ আগস্ট)। এতদিনে উক্ত সরকারী কর্মকর্তার চিঠি যুক্তরাস্ট্রে কারো কাছে পৌঁছেছে বলে ধরে নিলেও এর পরের অধ্যায়গুলো আমাদের মত ছা-পোষা মানুষেরা কোনদিনও জানতে পারবে না।
বাংলাদেশের সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে অথচ বাংলাদেশই জানে না? কি সাংঘাতিক কথা! অবশ্য জানার কথাও না! কারন আমাদের ইন্দ্রিয়জ্ঞানের দৌড় প্রতিযোগিতা যদি গজেন্দ্রের সাথে হয় তাহলে দোষ দিবই বা কাকে? যাহোক, তাহলে কাদেরকে জানিয়ে এটি করা হল? আবার কেনইবা করা হল? সীমান্তের ওপারের দেশটিও আমেরিকাকে এ ব্যাপারে না করেনি। সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির স্বার্থ আধিপাত্যবাদী আঞ্চলিক শক্তির সাথে এক হয়ে গেলে সেখানে আর ‘না’ বলে কিছু থাকেনা। নতুন করে এ অঞ্চলে তথাকথিত ‘অশুভ চক্র (axis of evil)’ বানানোর সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ‘অবৈধ একটি সন্তান’ জন্ম দেয়ার খায়েস আর সইতে পারছে না সময়ের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ন আমাদের প্রতিবেশী কিছু অবিশ্বাসী বন্ধুরা। জাতিসংঘসহ বড় বড় দেশের উঁচু পদে সমাসীন থাকার সুবাদে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশবিরোধী নানামুখী অপ্রচার ও কৌশলের নতুন মাত্রায় আজ অবতীর্ন এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন শচীন কর্মকার গত ২৭ জুলাই এক ই-মেইল ম্যাসেজের মাধ্যমে সিআইএ পরিচালকের কাছে ভারতের পূর্ব সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশ ভূখন্ডে ইরাকের কুর্দিস্তানের অনুরুপ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টানদের জন্য পৃথক স্বায়ত্তশাসিত সংখ্যালঘু এলাকা প্রতিষ্ঠায় মার্কিন সাহায্য চেয়েছে। মাইনরিটি কংগ্রেস পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পাদক এই কর্মকার ‘নাইন ইলেভেনের পর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে’ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আজ আমাদের সাহায্য করো, আগামীকাল আমরা তোমাদের সহায়তা করবো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেমন ইহুদীরা ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন, বাংলাদেশেও এখন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টানরা ঠিক একইভাবে মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে’। (সূত্রঃ দৈনিক আমারদেশ, ২৯ নভেম্বর ২০০৭)
আজ একথা বলার অবকাশ নাই যে, পরিবর্তিত বিশ্বে ভারত নতুন করে তার সবল উপস্থিতি প্রমাণ করতে চাইছে। দেড় বিলিয়ন জনঅধ্যুষিত দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে ভারত তার সামাজিক , সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাব-প্রতিপত্তির আধিপাত্যের কারনে বিশ্বরাজনীতিতে চীনের সমান্তরালে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করতে উঠেপরে লেগেছে। সেজন্য বিশ্বব্যাপী তাদের একদল গবেষক নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। চীনের সাথে মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ভাল সম্পর্কের বিপরীতে ভারত তার ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিন -পূর্ব এশিয়ার মাঝখানে দক্ষিন এশিয়ার অবস্থান। ভারতের বিকাশমান অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ন অঞ্চল বুঝাতে চীনকে স্মরন করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারত মহাসাগরের উপর দিয়েই চলছে মুসলিম বিশ্বের ৭৫ শতাংশ বানিজ্যের আদান-প্রদান। রাশিয়া, আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের শক্তি প্রদর্শনের মূল কেন্দ্রও কিন্তু এখানেই। সেদেশের অবসরপ্রাপ্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কর্ণেল হারিহারান বলেন, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর আশ্রয়ে পোষ্য গনতন্ত্র এবং চীনের সিংগেল পার্টি মডেলের বাইরে একমাত্র ভারতের বৃহত্তর ও আধুনিক গনতন্ত্রই এ অঞ্চলের অভিবাবকের ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা রাখে। তাছাড়া এদেশের রয়েছে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত নিউক্লিয়ার শক্তিধর বৃহৎ সামরিক শক্তি’। (SAAG, Paper No: 2804)

সেদেশের ইংরেজী নিউজ চ্যানেল সিএনএন-আইবিএনের প্রধান সংবাদদাতা সুমন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, রাজস্থানের হিন্দু মৌলবাদী সরকার ‘অবৈধ’ বাংলাদেশীদের শায়েস্তা করতে গুয়ান্তেনামো বে’র আদলে ট্র্যানজিট ক্যাম্প স্থাপন করতে চায়। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বাসুন্ধারা রাজে বলেছেন, ‘Round them (Bangladeshis) up and put them in transit camps and feed them (তাদেরকে বেঁধে ট্র্যানজিট ক্যাম্পে ভরে রাখো এবং সেখানেই খাওয়াও)। অবশ্য তার এই অসাড় দাবীকে উড়িয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাস্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘Perhaps she is shaken after recent blasts in Jaipur and is saying anything that is not true. She should have avoided (making the statement). She has just exposed her weakness.’
(খুব সম্ভবত মহিলাটি জয়পুরে সাম্প্রতিক বোমা বিস্ফোরনের কারনেই নড়েচড়ে উঠছেন। তিনি যা বলছেন তা সত্য নয়।এ ধরনের কথা বলা তার উচিৎও হয়নি। মুলতঃ (ঘটনা মোকাবেলা না করে) এর মাধ্যমে তিনি তার দুর্বলতাই প্রকাশ করছেন।) (সূত্রঃ বিডিনিউজ২৪, মে২৪, ২০০৮)

বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মাকসুদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আমরা একটা সন্ত্রাসের কালে বাস করছি। সব দেশেই কমবেশি সন্ত্রাস আছে। উপমহাদেশের দেশগুলোতেও মাঝেমধ্যে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা ঘটে। ভারতে কোথাও কোনো বোমা বিস্কোরিত হলে, তাতে মানুষ প্রাণ হারালে, এক সেকেন্ড বিলম্ব না করেও সেখানকার স্বাধীন সংবাদপত্র ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা’র বরাত দিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে। হোলির আগের দিন দিল্লির মার্কেটে বোমার ঘটনায় অথবা হায়দরাবাদের রেস্তোরাঁয় বোমা বিস্কোরণের ঘটনায় যেমনটি ঘটেছে এবারও তাই হলো। বাংলাদেশের ইসলামি অপরাধীরা যে ওই অপরাধ করতে পারে না তা নয়, যদি করে তাহলে তাদের উপযুক্ত শাস্তি জেল-ফাঁসি আমরা দাবি করব। কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার এক মিনিটের মধ্যে একটি দেশের দিকে তর্জনী তাক করা সমীচীন কি না তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবার বিষয়। একটি দেশ মানে সে দেশের গোটা জনগোষ্ঠী।গুয়ানতানামো ক্যাম্পের মতো কোনো ক্যাম্পে আটক করে নির্যাতন করা ভারতের মতো একটি মহান গণতান্ত্রিক দেশের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যদি কোনো বাংলাদেশি অবৈধভাবে সেখানে গিয়েও থাকে তারও মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব গণতান্ত্রিক ভারত সরকারের।‘ (প্রথম আলো, ২৭ মে ২০০৮)

এবার আমরা জানার চেষ্টা কেমন আছেন দেশের সীমান্তবাসীরা এবং ভারতীয় মিডিয়াইবা সীমান্তের খবরগুলো কেমন চোখে দেখে।

নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী কুখ্যাত ডাকাতদের র‌্যাব মেরে ফেললে যেখানে মানবতা উৎরে ওঠে, গরু ব্যবসায়ী জাকির হোসেনদের মেরে লাশ গুম করে ফেললেও মানবতা সেখানে ভুলুন্ঠিত হয়না! ‘নিয়মবহির্ভূত সব হত্যাই নিন্দনীয় অপরাধ’ এ সত্যটুকু স্বীকার করার সৎসাহসও আমাদের যেন নেই। কেন যেন নামকরা মানবাধিকার কর্মীদের সব ভন্ডামী সীমান্তে এসে আটকে পড়ে।
এসব নিস্পাপ ও দূর্বল ‘পাখির ছানাদের’ নিয়ে ওপারের জাঁদরেল শিকারীদের খেলা আমাদের দেশের নামকরা মানবতাবাদী ও একশ্রেনীর রাজনীতিকরা বোধ হয় উপভোগই করেন বলতে হবে।
২০০৮ সালের ১ জানুয়ারী দেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’- উল্লেখ করেছে, শুধুমাত্র ২০০৭ সালে ১২ মাসেই ১২০ জন গরু ব্যবসায়ী ও আবাদী কৃষককে পাখির মত গুলী করে মেরেছে বিএসএফ। অর্থাৎ মাসে কিনা ১০ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে গত বছরে। অপহরণ করেছে ৯৮ জনকে, ৩ জন বাংলাদেশী নারী বিএসএফ’র হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১৯৮ জন বাংলাভাষী নাগরিককে পুশ-ইন করা হয়েছে। প্রতি বছর এ হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত সাড়ে আট বছরে ৭০৭ জন অর্থাৎ বছরে গড়ে ৮৩ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বিএসএফ। ২০০৮ সালের এই লেখা (২৫ আগস্ট) পর্যন্ত মোট ৭৮ জনের অকাল মৃত্যু হয়েছে তাদের হাতে। এখানেই শেষ নয়, সরকারীভাবে ভারত দাবী করে আসছে তাদের দেশে বড় বড় সব অনাসৃষ্টির পেছনে বাংলাদেশের হাত রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো তারা দাবী করে, এসব কাজে নাকি সহায়তা দিয়ে আসছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। উত্তর ভারতে উলফার স্বাধীনতা আন্দোলন, বোডোল্যান্ড আন্দোলসহ সব চরমপন্থী আন্দোলনের কলকাঠি নাড়া হয় নাকি বাংলাদেশ থেকেই।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের রয়েছে ৪,০৯৫ কিমি (২৫৩৯ মাইল) বিস্তৃত সীমান্ত। বাংলাদেশের অভিযোগ-অনুরোধ অগ্রাহ্য করে সীমান্তে ভারত মোট ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করবে, সীমান্তের বাকি এলাকা দুর্গম। ইতিমধ্যে ২ হাজার কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শেষও হয়েছে।
ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্ত প্রসংগ কেমনভাবে উপস্থাপন করা হয় তা জানার অধিকার বোধ হয় প্রত্যেক বাংলাদেশীরই রয়েছে। বাংলাদেশে ‘ভারত-বান্ধব’ বলে পরিচিত অনেক স্ক্রীন ও প্রিন্ট মিডিয়ার কথা শোনা যায়। কিন্তু ভারতে ‘বাংলাদেশ-বান্ধব’ বলে পরিচিত কোন মিডিয়া আছে কিনা তা বোধ হয় আমাদের নয়াদিল্লীতে কর্তব্যরত হাইকমিশনারই ভাল বলতে পারবেন।
গত ১৮ জুলাই, ২০০৮ ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা দুইজন বিডিআর সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর পাঁচদিন পর আবারো সংঘর্ষ বাঁধে। ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে খবরটি আসে মোটামুটি এভাবে।
বিডিআরের গুলিতে বিএসএফ জওয়ান ইয়াদুর আপ্পা জীবন উৎসর্গ করলেন। সম্পূর্ন বিনা উস্কানীতে বিডিআর এ ধরনের অপকর্ম ঘটালো গত পাঁচ দিনে দুইবার। ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের জওয়ানসহ সাধারন গ্রামবাসীদের এভাবেই বিডিআর হত্যা করে। ২৩ জুলাই ১২৩নং ব্যাটালিয়নের সুদর্শন (৪০)কে বিডিআর হত্যা করেছে। মিরসুলতানপুর গ্রামের এক কৃষককে চাষরত অবস্থায় গুলী করে মালদা হাসপাতালে পাঠিয়েছে ওরা। বিএসএফের গুলীতে দুইজন বিডিআর কর্মকর্তার করুণ বিয়োগাত্বক ঘটনার ব্যাখ্যা করতে গিয়েও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে ভারতীয় প্রচার মাধ্যম। মেরিনিউজ নেটওয়ার্ক চোরাকারবারীদের সাথে বিডিআরকেও অভিযুক্ত করে লিখেছে, অবৈধ গরু ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ রাইফেলসের মৌন সম্মতিতেই তাদের চালান বাংলাদেশে পাঠায়। বিএসএফ সদস্য রামকিষান পান্ডে স্পীডবোটে ৩০০টি গরুর একটি পালকে রোধ করতে ধাওয়া করে। অথচ কারন ছাড়াই বিডিআর ১০০ রাউন্ড গুলী ছুঁড়তে ছুঁড়তে বিএসএফের দিকে ধেয়ে আসে। বিএসএফ এর জবাবে আত্মরক্ষার্থে মাত্র ১৯ রাউন্ড গুলী করে। বিডিআরের এরকম অযাচিত গুলীতে আহত হয়ে রামকিষান গঙ্গায় পড়ে গিয়ে সাঁতরে তীরে উঠেন। পরবর্তীতে বিএসএফ ২৫০টি গরুর মাথা উদ্ধার করে যার মুল্য ৭০ লাখ রুপী। অবশ্য চোরাচালানকারীরা ৫০টি গরুর মাথা নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছে। এরপর সোভাপুর আউটপোস্টে ফ্ল্যাগ মিটিং বসে। দু’পক্ষই সংকল্পবদ্ধ হয় এ ধরনের ঘটনার পূনরাবৃত্তি রোধের। মেরিনিউজ খবর বিকৃতি করে আরো জানায়, পূর্বাপর বিভিন্ন ঘটনা প্রমাণ করে বিডিআর এসব ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের সিদ্ধান্তকে খুব বেশী পাত্তা দেয়না।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ উক্ত ঘটনাটির কারন অনুসন্ধান করে একটি বিশ্লেষনাধর্মী রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে বলা হয়, জুলাই ১৭, ২০০৮ রাতে একটি স্পীডবোট ও ইঞ্জিন চালিত একটি নৌকা নিয়ে বিএসএফ পদ্মা নদীতে টহল দিতে দিতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের দেড় কিমি ভেতরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার রঘুনাথপুর গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়ে। রাত পৌনে বারোটায় বিডিআর অনুপ্রবেশকারীদের ধরার চেষ্টা করলে স্পীডবোট থেকে বিএসএফ গুলী ছোড়ে। প্রাণ হারান বিডিআর অফিসার আব্দুল হান্নান এবং কৃষ্ণপদ পাল। প্রমান হিসেবে ‘অধিকার’ প্রত্যক্ষদর্শীদের নাম দিয়েছে গ্রামবাসী জিয়াউল হক, ৩৯ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের অপারেশন অফিসার মেজর আবু হাসান ও নিহতদের পোস্ট মর্টেম সম্পন্নকারী চিকিৎসক ডাঃ তাজউদ্দীন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিএসএফ কর্তৃক দুইজন বিডিআর নিহত হওয়ার খবর সম্পূর্ন অস্বীকার করে প্রেস রিলিজ দেয়। এত বড় ডাহা মিথ্যাচার কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম করতেও শরম পেয়েছে। ঢাকায় বসে প্রেস রিলিজে হাইকমিশনার জানায়, ‘বিএসএফের গুলী বিনিময় হয়েছে স্মাগলারদের সাথে, বিডিআরের সাথে নয়’। ভারতের সৌভাগ্য, এমন উদ্ধত ও মিথ্যা কথা বলায় হাইকমিশনারকে তলব করা তো দূরের কথা দায়ছাড়া গোছের ‘দুঃখজনক’ শব্দ ছাড়া দেশপ্রেমিক কোন শক্তির পক্ষ থেকে কড়া কোন প্রতিবাদও আসল না। অবশ্যি ভারতীয় বশংবদের বিপরীত প্রজাতির কেউ এমন কথা বলে থাকলে আমাদের মিডিয়া তৎপর হয়ে তাকে ক্ষমা চাওয়াতে বাধ্য করত। যাহোক, মেজর হাসান অভিযোগ করেন, ভারত ১৯৭৫ সালে প্রণীত ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্ত গাইডলাইন মেনে চললে এ ধরনের ঘটনা কখনো ঘটত না।
সবশেষে আমরা বলতে পারি, ভাল প্রতিবেশী পাওয়ার ভাগ্য সবার কপালে জোটে না। মর্যাদাকর রাস্ট্র প্রতিষ্ঠায় সারাক্ষন প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করাও কোন কল্যানকর রাস্ট্রের কাম্য নয়। আমরা তা চাইও না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তাই বলে ‘জ্বী হুজুর মার্কা’ নতজানু পররাস্ট্রনীতি শক্তিধরদের মোকাবেলার কোন সমাধানও দিতে পারেনি। এভাবে ঠান্ডা মাথায় যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়া নিয়মিতভাবে মানুষজনকে পাখির মত গুলী করে হত্যা ও অন্যদেশ কর্তৃক সীমান্ত সার্ভে করা পৃথিবীর অন্য কোন দেশের চৌহদ্দিতে হয় কিনা জানিনা। আমাদের দেশ, জীবন ও মান এত সস্তা হতে পারেনা। দূর্বল সরকারের সুযোগে স্বদেশের সার্বভৌমত্ব বিনাশে অশুভ কোন শক্তির উদ্ভব পক্ষ-বিপক্ষ কারো জন্য মংগল বয়ে আনবে না। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে গৌরবজনক অবস্থানে নিতে সীমান্তকে সুরক্ষিত করতে হবে। শান্তিকামী বিশ্বসম্প্রদায়ের সহায়তায় দ্রুত আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী বার বার টান টান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পথ সম্মানজনক উপায়ে চিরতরে রুদ্ধ করা সময়ের দাবী।
*লেখাটা দৈনিক নয়াদিগন্ত ছেপেছে ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮-এ।

Thursday, September 4, 2008

মানুষ খুঁজে পাওয়া গেল ব্রাজিলের জংগলে










একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানুষেরা বিজ্ঞানের এমন শীর্ষে অবস্থান করছে যে আজ তারা মঙ্গলগ্রহে প্রাণের সন্ধানে ব্যস্ত। মার্কিন মহাকাশ প্রতিষ্ঠান ‘নাসা (NASA)’-র ৪২২ মিলিয়ন ডলার মিশনের একটি নভোযান ‘ফিনিক্স’ গত ২৫ মে মঙ্গলগ্রহের ভূ-পৃষ্ঠে অবতরন করে। ফিনিক্স সেখানে চার মাস এক সপ্তাহ চলাফেরা করে পৃথিবীতে ক্ষণে ক্ষণে রিপোর্ট পাঠাবে। তার কাজ হল প্রাণের অস্তিত্বের অনুসন্ধান করা। ধারনা করা হয়, মঙ্গলের মাটির কয়েক ইঞ্চি নীচে রয়েছে বরফের স্তর। ফিনিক্সের দায়িত্ব হল মাটিতে কতটুকু পানি বা কোন জীবানু লুকিয়ে রয়েছে কিনা তার অনুসন্ধান করা। এই নভো খেয়া যানটি এ পর্যন্ত কয়েকটি ছবি পৃথিবীতে পাঠিয়েছে । তার মধ্যে একটি ছবিতে এক ফুট তিন ইঞ্চি গভীর সাদা রঙের কোন বস্তুর দেখা পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন এটি হয় বরফ নতুবা লবন। বরফ হলে এর শোধিত হওয়ার দাবী রাখে অথবা তরলীকরন ছাড়াই এটি কঠিন থেকে বায়বীয়তে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। কারন হল, গ্রহটির শীতল তাপমাত্রা (দিনের বেলায় ১৫ ডিগ্রী ও রাতে মাইনাস ১৪০ ডিগ্রী সেলসিলয়াস) এবং বায়ুমন্ডলের চাপও কম । আর যদি লবন হয়, তবুও তাৎপর্যপূর্ন। কারন, পানি বাস্পীভূত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠে লবন তৈরির পদ্ধতিটাই হল সাধারন। বিজ্ঞানীরা পানির অস্তিত্ব প্রমানে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সর্বশেষ ছবিতে তারা নিশ্চিত যে পানি আছেই। আরো প্রমানের জন্য তাঁরা উক্ত মাটির খন্ডটিকে পৃথিবী থেকেই ১৮০০ ডিগ্রীতে উন্নীত করার পরিকল্পনাও করছেন।

পৃথিবীর থেকে ন্যুনতম ৫০ মিলিয়ন মাইল দূরের গ্রহে প্রাণ আবিস্কারের নেশায় মানুষের যদি এই অবস্থা হয়, তখন একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের আর সব অগ্রগতি সম্মন্ধে কিইবা বলার থাকে? অথচ এই পৃথিবীর কোন জংগলেই লুকিয়ে রয়েছে হরেক রকমের মানবগোষ্ঠী যাদের সম্মন্ধে আধুনিক মানুষদের কোন ধারনাই নাই। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে, সভ্য দুনিয়ার সাথে কোন সংযোগই নাই, গহীন বনে বাস করা এরকম গোত্রের মানুষ এখনো প্রচুর?

ব্রাজিল ও পেরুর সীমান্তবর্তী প্রদেশ ‘আকরি (Acre)’-র বনাঞ্চল আমাজনের দক্ষিনাঞ্চলের গহীন অরণ্যে এই ‘সংস্পর্শবিহীন গোত্র (Uncontacted tribe)’-এর সন্ধান পাওয়া গেছে। নৃতাত্ত্বিকদের ভাষায় ‘আনকন্টাক্টেড ট্রাইব’ তাদেরকে বলা হয়, যাদের সম্মন্ধে বাইরের মানুষেরা কমবেশী জেনে গিয়েছে কিন্তু তাদেরকে সভ্য মানূষদের সংস্পর্শে আনা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এ বছরের এপ্রিল ২৮ থেকে মে ২ পর্যন্ত ছোট ঊড়োজাহাজ নিয়ে টানা বিশ ঘন্টা ধরে ক্যামেরা নিয়ে এই নতুন গোত্রের মানুষদের সনাক্ত করা হয়। ৩০ মে বিবিসি, সিএনএন, ইউটিউবসহ আন্তর্জাতিক সব মাধ্যমে ছবিগুলো প্রকাশিত হয়। আদিবাসীদের নিয়ে ব্রাজিলের সরকারী গবেষনা প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন (The National Indian Foundation, সংক্ষিপ্ত নাম, ‘ফুনাই Funai’)’ বলেছে, সারা পৃথিবীতে একশোরো বেশী সংস্পর্শবিহীন গোত্রের মানুষজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন জংগলে। এদের মধ্যে শুধু মাত্র পেরু বা ব্রাজিলেই থাকতে পারে অর্ধেকেরো বেশী। ‘সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল (Survival International)’ নামে অলাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান, যারা আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলে, তাদের মতে সব গোত্র সমূহই জোর করে তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত, হত্যা ও নানাবিধ রোগ-শোকে আক্রান্ত হওয়াসহ প্রভূত বিপদের সম্মুখীন।

ওইসব গোত্রের মানুষদের নিকট পৌঁছানো যথেষ্ঠ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। একে তো গহীন অরন্য, তারপর রয়েছে আদিবাসী কর্তৃক ‘বহিঃশত্রু অনুপ্রবেশকারীদের’ ঠেকানোর জন্য গাছের বড় বড় গুড়ি রাস্তায় ফেলে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি। এর ফলে তাদের সম্মন্ধে জানার শেষ পথও অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ আবিষ্কৃত নতুন এই গোত্রের মানুষদের চিহ্নিত করার মধ্যদিয়ে ব্রাজিলে এ পর্যন্ত মোট ৬৮ টি আনকন্টাক্টেড ট্রাইবের সন্ধান পাওয়া গেল, যারা কিনা আধুনিক দুনিয়ার মানুষ থেকে সরাসরি বিচ্ছিন্ন। হেলিকপ্টার দিয়ে প্রাপ্ত ছবিগুলোতে দেখা যায়, অচেনা এই গোষ্ঠীটি তীর, বল্লম নিয়ে ক্যামেরা বরাবর তাক করছে। তাদের বাড়িগুলো দেখে মনে হচ্ছে তাল জাতীয় শাখাহীন বৃক্ষের গুল্ম, লতা-পাতা দিয়ে ছাওয়া কুটির। এসব কুটিরকে বলা হয় ‘ম্যালোকাস (malocas)’। কুটিরের বাসিন্দারা বুঝি ভাবছে তাদের এলাকাটি হুমকির সম্মুখীন। তাই প্রতিরক্ষার জন্য তাদের নিত্য ব্যবহার্য হাতিয়ারসমূহ দ্বারা হেলিকপ্টারকে প্রতিহত করতে যুদ্ধ সাজে প্রস্তুত হয়ে আছে।

সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের ডিরেক্টর স্টিফেন কোরী (Stephen Corry) বলেছেন, অনেকেই এই গোষ্ঠীটির অস্তিত্বের ব্যাপারে পূর্বে সন্দিহান ছিল। আজ এইসব ভিডিও ছবির মাধ্যমে পরিষ্কার হল যে আজো পৃথিবীতে অজানা মানুষের উপস্থিতি বিদ্যমান। এদেরকে সভ্য মানুষ বানানোর নামে তাদেরকে জংগল থেকে একেবারে নিয়ে আসারও পক্ষপাতী নন নৃতত্ত্ববিদরা (Anthropologists)। তাঁরা বলছেন, তা হলে হবে ‘স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের মত অপরাধ’ যাকে বলে ‘মন্যুমেন্টাল ক্রাইম (monumental crime)’।

কেননা, এদেরকে আধুনিক মানুষ বানানোর প্রচেষ্টার পূর্বের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। সভ্য মানুষদের সংস্পর্শে এসেই তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমাদের খাবার খেতে পারেনা। সিদ্ধ করা খাবারে তাদের জিহবায় গোটা গোটা ফুসকুরি জাতীয় এমন সব অজানা রোগে আক্রান্ত হয় যা কিছুতেই সারানো যায় না। পানি-বসন্ত থেকে শুরু করে সাধারন ঠান্ডা-কাশিতেই তাদের মৃত্যু হয়। শরীর আধুনিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহন না করায় খুব সহজেই সাধারন অসুখেই প্রানহানি হওয়ায় নৃতাত্ত্বিকেরা তাদেরকে বাহিরে আনার প্রচন্ড বিরোধী।

ফুনাই (Funai)-র তোলা ফটোগুলো থেকে ধারনা করা হয়, গোত্রের প্রায় এক ডজনের মত মানুষ, যাদের শরীরের বেশীরভাগই অনাবৃ,ত, ৬টি কুটিরের সামনে তীর, ধনুক নিয়ে পজিশনরত। লাল রঙ দিয়ে শরীর চিত্রিত করা মানুষদের পুরুষ হিসেবে, আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো রঙ দ্বারা সারা গা মাখানো জনকে মহিলা হিসেবে মনে হয়।ছবিতে পুরুষদের খুব শক্তিশালো মনে হচ্ছে।

আরো ছবি দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুনঃ
এই দল সম্মন্ধে নৃতত্ত্ববিদরা একেবারে জানেন না বললেই চলে। তবে তাদের সন্দেহ গোত্রটির সাথে ‘টানো (Tano)’ এবং ‘আরোয়াক (Aruak)’-এর সংযুক্ততা থাকতে পারে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ায় একশোটিরো বেশী এসব সংস্পর্শহীন গোত্র বিভিন্ন অরন্য, সাগরতীরে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করছে। অবৈধভাবে বৃক্ষ নিধনের ফলে সম্প্রতি পেরুর সীমান্ত থেকে প্রায় পাঁচশো জন ইন্ডিয়ান (আদিবাসীদেরকে ইন্ডিয়ানও বলা হয়) ব্রাজিলের দিকে গহীন পুরু অরণ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। আধুনিক লোকদের সংস্পর্শে থাকা তার পছন্দ করেনা।

দীর্ঘ ও ভারী বল্লম নিয়ে হৃষ্টপুষ্ট শরীরের মানুষগুলোদের ‘শত্রু’ মোকাবেলার ভংগিকে রীতিমত যোদ্ধাদের দল বলে মনে হয়। জীব-জন্তুদের সাথে বাস করায় তাদের দাঁড়ানোর ভংগিটিও হয়তোবা কোন জন্তুর কাছ থেকে নকল করেছে। তবে বাসস্থানের জন্য ঘর বানানোর সাধারন বুদ্ধি ও কৌশল বুঝি তাদের রয়েছে। নইলে ঘরগুলো ঠিক আমাদের সাধারন মানুষদের ঢালু দুচালের শনের তৈরি ঘরের মতো হত না।

ব্রাজিলে সর্বমোট প্রাপ্ত ৬৮টি সংস্পর্শহীন গোত্রের প্রায় সব ক’টিই পাশ্চাত্যের সভ্যতার ব্যাপারে কমবেশী জ্ঞান থাকার কথা। কারন, রাবার চাষী, বন-চোর ও অন্যান্য গোত্র (যারা বাইরের মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখে)-র সাথে বেচাকেনা ইত্যাদিতে তাদের সাক্ষাৎ মেলে।

সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল অনুমান করেছে, পৃথিবীব্যাপী প্রায় ১০০টি গোত্র রয়েছে যারা সভ্য দুনিয়া থেকে একেবার সংস্পর্শহীন থাকাতেই পছন্দ করে যদিও বাইরের দুনিয়া সম্মন্ধে জ্ঞান তাদের কিছুটা রয়েছে। সত্যি বলতে কি, এসবগুলোর মধ্যে বংগোপসাগরের তীরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দা ‘সেন্তিনেলিজ (Sentinelese)’ গোত্রই মুলতঃ জানার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে একমাত্র ‘সংস্পর্শহীন গোত্র’। কেননা, এরা কোনভাবেই বাইরের সাথে সম্পর্কিত নয়। দক্ষিণ আন্দামানের উত্তর সেন্তিনেলে ৭২ বর্গ কিমি জুড়ে এদের অবস্থান। দ্বীপের নিকটবর্তী মানুষেরা তাদেরকে কদাচিৎ দেখলেও বিস্তারিত জানার সুযোগ নেই। কারন, বাইরের কাউকে দেখলেই এরা ধেয়ে আসে, দখলদার ভেবে তীর ছুঁড়ে তাড়িয়ে দেয়। ২০০১ সালে ভারতের আদমশুমারী অনুযায়ী এদের সংখ্যা বলা হয়েছিল ২১ জন পুরুষ ও ১৮ জন মহিলা। কিন্তু সত্যিকার তথ্য পাওয়া অসম্ভব। গবেষকরা মনে করেন, এই সংখ্যা হবে কমপক্ষে ৪০ থেকে সর্বোচচ ৫০০ জন। ২০০৪ সালে ভারত সাগরের ভূমিকম্প ও সুনামীতে তাদের ভাগ্য জানা না গেলেও তারা যে বেঁচে আছে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সেন্তিনেলিজদেরকে বলা হয় ‘নেগ্রিটস (negritos)’ যারা হবে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার মানুষজন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন এক জাতি। আবার এদের সাথে সংযুক্তা রয়েছে মালয় দ্বীপপুঞ্জের ‘সেমাং (Semang)’ গোত্রের সাথে। ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের ‘এইটা (Aeta)’ গোত্র, এমনকি দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সাথেও এদের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন নৃতাত্ত্বিকেরা।

তুলনামূলকভাবে নেগ্রিটদের খাটো ও কালো চামড়ার শরীর এবং কুকড়ানো চুলসহ এমন সব আরো বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া গেছে, যাদের সাথে আবার আফ্রিকানদের চেহারাও মিলে যায়। তবে এরা কিন্তু সাধারন আন্দামানবাসীদের চেয়ে লম্বা। গড় উচচতা পুরুষদের ৬ ফুট ও মহিলাদের ৫ফুট ৪ ইঞ্চি।

এসব আদিবাসীদের জীবন-রক্ষা ও তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে বিশ্ববাসীর আরো চিন্তা করা দরকার। নইলে এই মানুষগুলো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে কোন গ্রহে প্রানের সন্ধান খোঁজার চেয়ে এই মানুষগুলোর প্রাণ রক্ষাও কম জরুরী নয়।
*লেখাটা ঢাকা থেকে প্রকাশিত মাসিক অন্যদিগন্ত সেপ্টেম্বর ২০০৮ সংখ্যায় এসেছে।

Tuesday, August 12, 2008

রাহুল গান্ধীর ‘ব্যক্তিগত সফর’ এবং আমাদের ‘বস্তি-দর্শন’ সংস্কৃতি



পাঁচদিন ‘ব্যক্তিগত সফর’ শেষ করে ভারতের লোক সভার সদস্য ও গান্ধী পরিবারের তরুন উত্তরাধিকারী রাহুল গান্ধী ৫ আগস্ট ঢাকা থেকে দিল্লী ফিরে যান। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) তার এই সফরকে ‘ব্যক্তিগত সফর’ নামে অভিহিত করে ইনভার্টেড কমা দ্বারা শব্দ দুটিকে আবদ্ধ করে দিয়েছে। আমরা সবাই জানি, কোন শব্দকে ইনভার্টেড কমা দ্বারা আবদ্ধ করার অর্থ হলো ওই কথার সাথে বক্তা ঐকমত্য পোষন নাও করতে পারেন। অবশ্যি বাংলাদেশীয় সব গণমাধ্যমই সরল বিশ্বাসে তার বাংলা দর্শনকে ‘শিক্ষা সফর’ নাম দিয়ে ফলাও করে প্রচার করেছে। আমরাও বিশ্বাস করতে চাই, তিনি আমাদের অসৎ প্রতিবেশী নন।

উপমহাদেশের বিখ্যাত এক পরিবারের সদস্য তিনি। সেই সুবাদে প্রাচীন ও বড় দল কংগ্রেসের সাধারন সম্পাদকও বটে। তিনি এক স্থানে বলেছেন, তার পরিবার যা চায় তাই হয়। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির উদ্ভব নেহেরু-গান্ধীপরিবারের ধারনা থেকেই উৎসরিত। এমন অপমানজনক কথা নিয়ে বাংলাদেশে উচ্চবাচ্য না হলেও খোদ ভারতের এমন কি পাকিস্তানের ফরেন অফিসও প্রতিবাদ পাঠিয়েছিল। এই প্রেক্ষিতে উপমহাদেশের নামকরা ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব বলেছেন”....... an insult to the Bangladesh movement. Rahul is free to say whatever he wants to, but in a democratic country playing up family is certainly not in good taste।“
অর্থাৎ এর মাধ্যমে রাহুল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে অপমান করেছে। সে যা খুশী তাই বলতে পারে কিন্তু পরিবার নিয়ে খেলা করা কোন গনতান্ত্রিক দেশের জন্য ভাল দৃষ্টান্ত নয়।

১৯৯২ সালে নরসীমা রাওয়ের আমলে বাবরী মসজিদ ভাঙার প্রসঙ্গে টেনে এনে রাহুল তার উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বলেছিলেন, ‘সে সময়ে গান্ধী-নেহেরু পরিবারের কেউ রাজনীতিতে জড়িত থাকলে এরকম ঘটনা ঘটত না।‘ বারে বারে পরিবার নিয়ে তার এরকম দেমাগোক্তিতে বিরুক্তি হয়ে দক্ষিনের বিজেপি নেতা বেংকাইয়া নাইডু বলেছেন, ‘তাহলে জরুরী অবস্থা আগমনের দায়িত্বও গান্ধী পরিবারকে নিতে হয়!‘

আমরা রাহুল সম্মন্ধে খানিকটা জানার আগে দেখি, কেমন কাটালেন ভারতের হবু প্রধানমন্ত্রী আমাদের নতুন অতিথি।

দিল্লীতে ফেরত যাওয়ার আগেরদিন বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রসমাবেশে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা দেয়া হয়েছিল এখানে এসে তা পাল্টে গেছে। আমাকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ একটি চরম মৌলবাদী মুসলিম সাম্প্রদায়িক দেশ। এখানকার জনগণ অত্যন্ত দরিদ্র। কিন্তু বাস্তবে এসে আমার মনে হয়েছে যে, এখানকার লোকজন অত্যন্ত উদার প্রকৃতির। চরমপন্থী কোনো মৌলবাদী দেশ এটা নয়। জনগণ সহজ সরল প্রকৃতির। অর্থনৈতিকভাবেও এখানকার অবস্থা যতটা খারাপ বলা হয়েছে ততটা নয়। ভারতের গরিব মানুষের চেয়েও এখানকার দরিদ্রদের অবস্থা ভালো। তিনি দুই দেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।‘ তাকে কারা বাংলাদেশ সম্পর্কে এরকম ধ্বংসাত্মক ধারনা দিয়েছেন তা আমরা জানি না। কারন এসব খারাপ কাজ সাধারনত দিনের আলোতে কেউ বলে কয়ে করেনা। তার কোন রেকর্ডও থাকেনা। সে যাহোক, ভারতের রাজনীতিতে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি রাহুল গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহম্মদ ইউনূসের এনজিও গ্রামীণ ব্যাংক ও ব্র্যাক সেন্টারের আমন্ত্রনে। এরকম খবরই অন্ততঃ আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। যদিও ‘দৈনিক আমাদের সময়’ ৬ আগস্ট লিখেছে, ‘এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্র্যাকের ম্যানেজার (কমিউনিকেশন) পুষ্পিতা আলম বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।‘ তিনি জানিয়েছেন, আসলে ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংকের আমন্ত্রণে রাহুল গান্ধী বাংলাদেশে আসেননি’।

গত পাঁচ দিন রাহুল গান্ধী মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারের ব্র্যাক ইনে অবস্থান করেন। এ সময় তার ও তার প্রতিনিধি দলের থাকা-খাওয়ার খরচ তারা নিজেরাই বহন করেন। কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, রাহুলকে দেওয়া নিরাপত্তা বাহিনী এসএসএফের খরচ বহন করেছে বাংলাদেশ পররাস্ট্র মন্ত্রনালয়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সফরকালে রাহুল গাজীপুরে ব্র্যাক কর্মসূচি ও মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে গ্রামীণ ব্যাংক কর্মসূচি পরিদর্শন করেন (দৈনিক সমকাল, ৬ আগস্ট)। তার নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সবগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছাড়াও ভারত থেকে স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ (এসপিজি)-এর ১০ সদস্যের একটি দল ঢাকায় আসে। রাহুল ভারতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জেড-প্লাস পেয়ে থাকেন।

তিনি তার সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বাস করা মানুষদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের উন্নয়নের চিত্র সম্বন্ধে ধারণা লাভ করেন বলে জানা যায়। বাংলাদেশের গ্রামীন জনপদ ও ভারতের বৃহত্তর অঞ্চলের গ্রামীন জনপদের মানুষদের বসবাসে মৌলিক পার্থক্য কতটুকু, তা তিনিই এখন ভাল বলতে পারবেন। এবার আমরা একটু নজর দিই আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহভারতের গ্রামীন জনপদে বাস করা মানুষদের সম্মন্ধে কি রিপোর্ট দেয়। দি ইন্ডিয়া টাইমস ১৮ এপ্রিল লিখেছে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন গন্তব্য (Millennium Development Goal) ধরা ভারতের জন্য এখন অলীক স্বপ্নবৈ অন্য কিছু নয়। ইউএন চিল্ড্রেন্স ফান্ড ভারতকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে সেদেশে শিশু মৃত্যর হার আশংকাজনকভাবে নাগালের বাইরে যাওয়ায় যা তার প্রতিবেশী দেশসমূহের চেয়েও অনেক গুন বেশী। ইউনিসেফের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ডিরেক্টর ড্যানিয়েল টুল (Daniel Toole) বলেছেন, ভারতে ৫ বছরেরও কম বয়সের ২.১ মিলিয়ন শিশু মারা যাচ্ছে প্রতি বছর।মেয়ে শিশুরা ন্যুনতম মৌলিক চিকিৎসাও পাচ্ছে না। আজো সেদেশে মেয়ে শিশুদের অনার কিলিং (honour killing) হয়। হু
(WHO) বলেছে, ‘বিভিন্ন সেক্টরেভারতে উন্নয়নের জোয়ার বইছে একথা যেমন সত্য, প্রতি দশজন
শিশুর একজন অপুষ্টিতে ভুগছে একথাও সমান সত্য।ভারত অচিরেই বিশ্বের ক্ষুধার্ত দেশসমূকে নেতৃত্ব দিবে।’
তাই সংগত কারনেই প্রশ্ন জাগে, ভারতে ছেড়ে বাংলাদেশের গরীবদের জানা তার আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কিনা।
ভাঙা চালের চা-স্টলে বসে চা পান করা কিংবা গ্রামে গিয়ে সাধারন মানুষদের সাথে ড্রাম বাজিয়ে নেচে গেয়ে
অভিজ্ঞতা অর্জন করা রাহুলের জন্য কি সত্যি মানায়? কেন যেন আমাদের দেশটা টুরিজমের তালিকায় বস্তি, ভাঙা
চাল, কিংবা ছিন্নভিন্ন নতুন করে স্থান পেয়ে গেল। হিলারী ক্লিনটনকে দিয়ে ডঃ ইউনুস যে যাত্রা শুরু করে দিয়ে
গেলেন, আজ মনে হয় তা সব এনজিওর জন্য অনুকরনযোগ্য ।

এছাড়া মিঃ জুনিয়র গান্ধী আরো একটি কাজ করেছেন। পত্রিকায় এসেছে, ‘রাহুল গান্ধীর সাথে গতকাল দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কর্মকর্তা ও সমমনা বুদ্ধিজীবীদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংক ভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক সম্পর্কে কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত বৈঠকটি চলে। বৈঠকের আগে সেখান থেকে টিভি ক্যামেরাম্যান এবং সাংবাদিকদের বের করে দেয়া হয়। সাবেক সিপিবি ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের সাথে উক্ত বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে এ কথা জানতে চাইলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় এবং এ বিষয়ে কথা বলা যাবে না। একদম নিষেধ করে দিয়েছেন।‘ এ কথা বলে তিনিও বেরিয়ে যান। বৈঠকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড· মোস্তাফিজুর রহমান, ট্রাষ্টি সৈয়দ মঞ্জুর এলাহি, ব্যবসায়ী লতিফুর রহমান, আনিসুল হক, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, সাবেক উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক চক্রবর্তীও এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়।‘ (সূত্রঃ নয়াদিগন্ত ও ইত্তেফাক ৫, ২০০৮)

গোপনীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সাংবাদিকেরা অনেক সময় অপছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে এলোমেলো কথা প্রকাশ করেন, যার জন্য শেষে অনেকেই লজ্জাজনক পরিস্থিতির শিকার হন। তাই আমরা কষ্ট করে হলেও ধরে নিলাম, উক্ত বৈঠকে মিডিয়া এড়িয়ে কানে কানে আমাদের সমাজের ব্রাহ্মগোত্র ভুক্ত সুশীল গোষ্ঠী রাহুলকে বুঝিয়েছেন, সিডর আক্রান্ত মানুষদের সাথে ৫ লাখ টন চাল দিবে বলে যে প্রতারণা করলে তা ঠিক করোনি, সীমান্তে পাখির মত গুলি করে আর মানুষজন মেরোনা, ট্রানজিট নিয়ে এরকম অযৌক্তিক জিদ ধরলে কি হয়, ফারাক্কার পানি ঠিকমত দিয়ে দাও, স্বাধীনতা যুদ্ধের পাওনাগুলো তাড়াতাড়ি মিটিয়ে দাও, আমাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরন করোনা ইত্যাদি। বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবিরা নিশ্চয়ই তাকে বুঝিয়েছেন, দেখো নিছক এসব কারনেই এদেশের মানুষ বারে বারে এক অখ্যাত মেজরের অসংগঠিত দলকে ক্ষমতায় বসায়।

আমাদের বস্তি-দর্শন সংস্কৃতি সম্মন্ধে জানার আগে শ্রীমান রাহুল গান্ধী সম্মন্ধে আর একটু জেনে নেই।
বিভিন্ন কারনে তিনি ভাল কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। বন্ধুরা বলে, তিনি খুবই লাজুক প্রকৃতির । তাই এসব বিষয়ে নিয়ে খুব খোলাসা করে কিছু বলেনও না। পশ্চিমে কাউকে রাজনীতি করতে গেলে প্রচুর ঘাম ঝড়াতে হয়। মেধাবী হতে হয়, পড়তে হয় নামকরা ইউনিভার্সিটিত, আইন বিষয়ে অনেক পড়তে হয়। কিন্তু আমাদের উপমহাদেশ এর ব্যতিক্রম। আজকাল কোন পলিটিশিয়ানেরই মেধাবী ছেলে-মেয়েরা রাজনীতিতে আসে না। কারন, এটা অত্যন্ত দূষিত ও নোংরা পরিবেশ। তাই পরিবারের বিগড়ে যাওয়া সন্তানদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় রাজনীতিকেই অবশিষ্ট ক্যারিয়ার নির্মানের সোপান হিসেবে।

রাহুল গান্ধী নয়াদিল্লীর মডার্ণ স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা নেন। ওই সময়ে পাঞ্জাবে চলছিল ব্যাপক সহিংসতা যার ফলে তার দাদী ইন্দিরা গান্ধীকে প্রান হারাতে হয় (অক্টোবর, ১৯৮৪)। স্কুল ছেড়ে বোন প্রিয়াংকা সহ তিনি বাড়ীতেই পড়তে থাকেন। ১৯৮৯ সালে সেন্ট স্টিফেন কলেজে ইতিহাসে ভর্তি হন। কিন্তু মাত্র এক বছরেই ডিগ্রী না নিয়ে কলেজ ছাড়তে হয়। এই কলেজে তিনি মেধার ভিত্তিতে সুযোগ না পেয়ে স্পোর্টস (শুটার) কোটায় ভর্তি হন। কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ অনল উইলসন বলেন, রাহুল তখন পরিবার নিয়ে খুব একটা গর্ব করত না। আর অল্পদিন পাওয়ায় তার মেধা যাচাইয়ের কোন সুযোগ আমরা পাইনি।

এরপর ১৯৯০ সালে চলে যান সোজা আমেরিকার হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিহাস ছেড়ে এবার ভর্তি হন অর্থনীতি বিভাগে। প্রেমে পড়েন কলম্বিয়ান বালিকা স্প্যানীশ ভাষী জুয়ানিতার। তারা এখন চুড়ান্ত পরিনয়ের অপেক্ষায়। রাহুল চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ করলেও প্রয়োজনীয় গ্রেডের অভাবে ডিগ্রী নিতে পারেন নি। তিনি মাঝে মাঝে চুপি চুপি দাবী করেন এমফিল করার। কিন্তু সংবাদ কর্মীরা হার্ভাডের এলামনাই এসোসিয়েশন ঘেঁটে প্রাক্তন ছাত্রদের তালিকায় তার নাম পাননি। রাহুলও আর এগোননি। এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়, রাজীব গান্ধীও কিন্তু ক্যামব্রিজে লেখাপড়ার শেষ পাঠটি চুকাতে পারেন নি। ইন্দিরা গান্ধীকেও অক্সফোর্ডের সমারভিল কলেজ থেকে ডিগ্রী না নিয়েই ফিরে আসতে হয়েছিল। আর কাকতালীয়ভাবে সবাই তারা তাদের প্রিয়জনকে খুজে পেয়েছিলেন ওইসব বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকেই। অনেকেই ব্যংগ করে বলেন, এজন্যই বুঝি বিধাতা তাদেরকে ওখানে পাঠিয়েছিলেন! এসব অসম্পূর্ন ডিগ্রী কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করতে পারেনি। নিয়মের অমোঘ ধারায় হয়তো রাহুলও সেভাবেই পার পেয়ে যাবেন।

রাহুল পুরোদমে এখন রাজনীতি শিখছেন।নেহেরু পরিবারের এই উত্তরাধিকারকেসেভাবেই পূর্ন প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। একদল উপদেস্টা সার্বক্ষনিক মনিটর করছেন । ইমেজ যাতে আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিক থেকে তারা আগের চেয়ে এখন আরো বেশী সচেতন। রাজস্থানের গভর্ণর শালেন্দ্র কুমার সিং-এর পুত্র কানিশক তাদের মধ্যে তরুন একজন। তিনি রাহুলকে উপমহাদেশের গতানুগতিক ধারার রাজনীতির বাইরে আনতে সদা তৎপর। ক্যারিশ্মাটিক নেতা বানাতে তাকে নিয়ে যান বস্তিতে, দলিত গ্রামবাসীদের সাথে রাত কাটান ইত্যাদি। এসবই হচ্ছে তাদের নব আবিস্কৃত রাজনৈতিক কৌশল।

বৈশাখের প্রথম প্রহরে শখ করে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার মত ক্যামেরা ম্যানদের সাথে বিদেশীদের বিশেষকরে সাদা চামড়াওয়ালদের নিয়ে বস্তিতে ছুটে যাওয়া কিংবা গ্রাম-দর্শন কালচার বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ প্রকট। উদ্দেশ্য মহৎ হলে অবশ্যই দোষের নয়। গরীব মানুষদের জন্য বড় বড় কথা না বলে সত্যিকার ভাবেই কিছু একটা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য, উতসাহব্যঞ্জকও। কিন্তু আসলে কি তাই?

Writer আমিনূল মোহায়মেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতর আলোকে স্বদেশকে বিদেশের মাটিতে ডুবানোর এরকম ভয়াবহ প্রকল খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন তার লেখা বাংলাদেশে মিডিয়ার নেতিবাচক ভূমিকাঃ প্রকৃতি, প্রভাব ও কারন প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘নব্বই এর দশকে বাংলাদেশে এনজিও খোলার হিড়িক পড়ে যায়। অধিকাংশ এনজিওর অর্থায়ন ঘটে বিদেশী উৎস থেকে। বিদেশ থেকে অর্থ আনার জন্য তারা বাংলাদেশের দারিদ্র, অনগ্রসরতা, ধর্মীয় কুসংস্কার - ইত্যাদিকে অতিরঞ্জিত করে বহির্বিশ্বে উপস'াপন করে। আমি এক সময় বাংলাদেশের একটি বৃহৎ এনজিওতে কাজ করতাম। হেড অফিসের একটি বিশাল ফ্লোর নিয়ে ছিল মিডিয়া ডিপার্টমেন্টের স্টুডিও। ভিডিওগ্রাফীর প্রতি আগ্রহ থাকার কারণে প্রায়ই সেখানে যেতাম। স্টুডিওতে চাটাই দিয়ে গ্রামের কুড়েঘর তৈরী করে সেখানে গ্রাম্য নারী সাজিয়ে অনেকের ইন্টারভিউ নিতে দেখেছি। এ ধরণের একটি ইন্টারভিউতে সাজানো গ্রাম্য নারীকে বর্ণনা করতে দেখেছিলাম তার উপর ফতোয়াবাজদের অত্যাচারের বানানো কাহিনী। সেই ভিডিওগুলো আবার ইংরাজীতে ডাবিং করে ফান্ড রেইজিং এর জন্য বিদেশে পাঠানো হতো। শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে চলচিত্রের সাথে সংশ্লিষ্টগণ দেশী-বিদেশী পুরস্কার পাবার আশায় বাংলাদেশের নেতিবাচক চিত্র ফুটিয়ে তুলে চলচিত্র তৈরী করেন। মাটির ময়নাসহ যে সকল বাংলাদেশী সিনেমা এ পর্যন- আন-র্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে তাদের সবগুলোতেই বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে দিক তুলে ধরা হয়েছে। জনপ্রিয় চলচিত্র নির্মাতা ও ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ একবার বলেছিলেন, আমাদের দেশের চলচিত্রের জন্য বিদেশী পুরস্কার পাবার প্রধান শর্ত হচ্ছে তাতে বাংলাদেশকে দারিদ্র পীড়িত, পশ্চাদপদ ও সাম্প্রদায়িক হিসাবে দেখাতে হবে। একই কথা বলতেন আমার সিনেমাটোগ্রাফীর শিক্ষক প্রখ্যাত চলচিত্রকার মরহুম আব্দুস সামাদ। বিশাল প্রবন্ধে তিনি আরো লিখেছেন, এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের দারিদ্র ও অনগ্রসরতা এখন একটা দর্শনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কেউ মিশরে গেলে পিরামিড দেখতে চায়, ইন্ডিয়ায় গেলে তাজমহল কিংবা বাঙ্গালোরের সিলিকন ভ্যালী দেখতে যায়। কায়রোতে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছনে কবরস্থানের উপরে বস্তি গড়ে উঠেছে। ওরা তাকে বলে মদীনাতুল মাইয়েত বা মৃতের শহর। সে দেশের সরকার ভিআইপি অতিথিকে এই শহরটি দেখাতে নিয়ে যায় না। ইন্ডিয়ায় অসংখ্য নবজাতক কন্যাশিশুকে প্রতিদিন জীবন- হত্যা করা হচ্ছে, অভাবের তাড়নায় কৃষকেরা আত্মহত্যা করছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত হচ্ছে অসংখ্য নাগরিক। তাদের নিয়ে তৈরী মিউজিয়ম বা এজাতীয় কিছু দেখাতে সে দেশের রাষ্ট্রীয় অতিথিদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় না। অথচ, আমাদের দেশে কোন ভিআইপি অতিথি এলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বস্তিতে, বাংলাদেশের দীন-হীন রূপটি দেখাতে। বাংলাদেশকে দারিদ্রের দেশ, মৌলবাদের দেশ, সাম্প্রদায়িকতার দেশ হিসাবে এরাই বিশ্বে পরিচিত করে তুলেছে।‘

এভাবেই চলছে ভদ্র কায়দায় সেলিব্রিটিদের দিয়ে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার নামে দেশবিরোধী প্রচারনা। আয়োজন চলছে দেশকে মডার্ন কলোনাইজশেনভুক্ত করে স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল বানানোর অদম্য প্রয়াস। ভাবতে কষ্ট লাগে ভারতের মতো যেদেশে কোটি কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নীচে মানবেতর জীবনযাপন করছে, তাদের কাউকেও আজ ধরে এনে বিল গেটসীয় কায়দায় বলানো হয়, আইটি খাতে বাংলাদেশের ছাত্রদেরকে লোভনীয় স্কলারশীপের ব্যবস্থা করার কথা বলবে রাহুল গান্ধী। একথা শুনে আমরা (যারা ডজন ডজন ভারতীয় ছাত্রদেরসাথে পড়াশোনা, এক সাথে চাকরি করার মাধ্যমে তাদেরকে ভাল করে জানি) শুধু নয় খোদ ভারতীয় নাগরিকরাই মুখ টিপে হাসে।আইটিতে তাদের অসামান্য উন্নতি নিঃসন্দেহে ঈর্ষার কারন, তাই বলে এ রকম বাগাড়াম্বর কথা শুনানো কি খুব বিলাসিতা নয় কি? এভাবেই কি দেশে দেশে গিয়ে আমাদের পন্ডিতজনেরা দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছেন?


* লেখাটি দৈনিক নয়াদিগন্ত ১৫ই আগস্ট, ২০০৮ এ প্রকাশ করেছে।
http://www.dailynayadiganta.com/2008/08/15/fullnews.asp?News_ID=98504&sec=6

Wednesday, July 30, 2008

এক নরক শিবিরের কাহিনী




কিউবার একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে গুয়ান্তেনামো উপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত আমেরিকার বিতর্কিত ‘গুয়ান্তেনামো বে নৌ-স্থাপনা’। আমেরিকানরা একশো বছরের বেশী সময় ধরে স্থাপনাটি নিয়ন্ত্রণ করছে। ফ্লোরিডার মায়ামী বীচ থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে দক্ষিণ দিকের উভয় অঞ্চলই ইউএস ‘জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স গুয়ান্তেনামো’ নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৮৯৮ সালের স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ পরবর্তীতে আমেরিকা কিউবার কাছ থেকে জায়গাটি লীজ হিসেবে নেয়। ১৯০৩ সালে দুই দেশের ঐক্যমতের ভিত্তিতে লিজটি সম্পাদিত হয়। আর এটিকে ১৯৩৪ সালে চুক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। কিউবার দৃষ্টিতে আমেরিকার বর্তমান উপস্থিতি অবৈধ। কারণ, বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ধরনের সমঝোতা ১৯৬৯ সালের জেনেভার ভিয়েনা কনভেনশনের ‘চুক্তি আইন’ -এর ৫২ নং ধারা সরাসরি লংঘন করে। কিন্তু আমেরিকার পাল্টা কথা হল, লীজটি ভিয়েনা কনভেনশনের আগে হওয়ায় উক্ত চুক্তি আইনের ৪ নং ধারানুযায়ী তাদের উপর ৫২ নং ধারাটি মানা অপরিহার্য নয়। যুদ্ধ জয়ের পর কিউবার প্রথম প্রেসিডেন্ট হলেন জেনারেল টমাস এস্ট্রাডা পামা (Tomas Estrada Palma)। তিনি হলেন আমেরিকার নাগরিক । মে ২০, ১৯০২ থেকে সেপ্টেম্বর ২৮, ১৯০৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনিই দুই সহস্র মার্কিন স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ৪৫ বর্গমাইল ব্যাপী দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণভার নিতে আমেরিকাকে প্রস্তাব দেন ১৯০৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী। ১৯৩৪ সালে স্বর্ণমুদ্রার বদলে সমপরিমান অর্থ মার্কিন ডলারে ৪,০৮৫ ধার্য্য করে নতুন চুক্তি সাধিত হয়। এভাবেই গুয়ান্তেনামো বে’র শিবিরটিকে স্থায়ী নিয়ন্ত্রনে নেয় আমেরিকা যুক্তরাস্ট্র। বারে বারে টানাপোড়ন চলতে থাকলেও দুদেশের মধ্যে ঐক্যমত বা আমেরিকা স্বেচ্ছায় ছেড়ে না দিলে অথবা আরেকটি বিশেষ কারন আসা না পর্যন্ত আজীবন এটি ইউএস নৌ-বাহিনীর একটি স্থাপনা হিসেবেই ব্যবহৃত হতে থাকবে।

এই স্থাপনায় মোট তিনটি ক্যাম্প রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে এগুলোতে বন্দীদের নির্যাতন করা হয় । নামগুলো হল, ‘ক্যাম্প ডেল্টা (Camp Delta)’, ‘ক্যাম্প ইগোয়ানা (Camp Iguana)’ ও ‘ক্যাম্প এক্স-রে (Camp X-ray)। ক্যাম্প এক্স-রেটি বর্তমানে বন্ধ আছে।

নাইন-ইলেভেনের পেট ফুঁড়ে অনেক অবৈধ সন্তানের জন্ম হয়েছে। তার একটির নাম হল গুয়ান্তেনামো বে’র এই ডিটেনশন ক্যাম্প বা বন্দী শিবির । সংক্ষেপে একে ‘গিটমো (Gitmo)’ বা GTMO-ও বলা হয়। এই ক্যাম্পের নাম শুনলেই একটি দৃশ্য সবার চোখের সামনে ভেসে উঠে । তাহলো, পেছন দিক থেকে দুই হাত-পা বাঁধা, মাথা থেকে গলা পর্যন্ত ঢাকা কমলা রঙের কাপড় পরিহিত একদল মানুষদের জন্তুর মত খোঁয়াড়ে রেখে আমেরিকান সৈন্যদের পাহারা দেয়ার দৃশ্য। জীবন্ত মানুষদের উপর কত রকমের যে নির্যাতন চালানো যায় তার ছিটেফোঁটা ছবি বিভিন্ন ফূটেজে দেখে পৃথিবীর তাবৎ বিবেকবান মানুষদের বাকরুদ্ধ হওয়ার বাকি নেই। সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণ করতে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতেই চলছে এসব অত্যাচার। এতই ভয়ঙ্কর সেসব অত্যাচার যে, তা চালাতে গিয়ে খোদ নির্যাতনকারীদেরই অনেককে পাগল হতে হয়েছে। মাথা থেকে ঘাড় পর্যন্ত ঢেকে দু’হাত পেছনদিকে পিঠমোড়া করে বেধে ইলেকট্রিক তার পায়ের সাথে লাগিয়ে হতভাগা বন্দীদের ছোট্ট এক খন্ড পাথরের উপর রাতদিন উঠবস করা হয়। যার বিরুদ্ধে অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটে জনপ্রিয় ‘আনসাবসক্রাইব (Unsubscribe)’ আন্দোলন শুরু করেছিল। দুনিয়ার এই দোযখকে সাবেক সোভিয়েত কম্যুনিষ্ট গুপ্তচর কর্তৃক শ্রমিকদের উপর নির্যাতনের ক্যাম্প ‘গুলাগ (Gulag)’-র সাথে তুলনা করেছিলেন সংস্থাটির সেক্রেটারী জেনারেল আইরিন খান। তার এই সাহসী উচচারনে বুশ, চেনী, রামসফেল্ড সবাই ক্ষেপেছিলেন। যথাক্রমে তারা বলেছিলেন ‘উদ্ভট (absurd)’,‘পীড়াদায়ক (offended)’, ও ‘নিন্দাযোগ্য (reprehensible)’ অপরাধ। পৃথিবীর সব মানবাধিকার সংস্থাসমূহ এই অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ক্যাম্পগুলো বন্ধের দাবী জানিয়ে আসছে বহুদিন ধরে।
২০০২ সালের জানুয়ারী মাসে আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৭৭৫ জন যুদ্ধ-বন্দীদের এখানে ধরে আনে আমেরিকা যুক্তরাস্ট্র। ‘বৈধ’ ভাবে জঘন্য অত্যাচার চালানোর কুমতলবে তারা ঘোষণা দেয় এসব বন্দীদের অধিকার জেনেভা কনভেনশন কর্তৃক ‘যুদ্ধ-বন্দী আইন’ দ্বারা সংরক্ষিত নয়। তার মানে হল, এদের উপর আচরণে কোন নিয়ম কানুন না মানলেও চলবে। ‘যুদ্ধবন্দী (Prisoner of War)’ নাম পালটে এদেরকে বলা হল ‘শত্রুযোদ্ধা (Enemy Combatant)’। টানা চার বছর অকথ্য নির্যাতন শেষে মার্কিন উচচ আদালত ২০০৬ সালের ২৯ জুন ঘোষণা দেয় এরা ‘শত্রুযোদ্ধা’ নয়, ‘যুদ্ধবন্দী’। আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ ওই বছর জুলাই ৭-এ আভ্যন্তরীন একটি মেমো দিয়ে বিশ্ববাসীকে এই বলে সান্ত্বনা দিল যে, ‘হুম্‌, ভবিষ্যতে তাদের সে মর্যাদা দেয়া হবে’। তবে সেই মর্যাদা কবে থেকে দেয়া শুরু হবে, সুনির্দিষ্টভাবে তা না বলে মানবাধিকার সংগঠনসমূহদের অন্ধকারে রাখা হল।

অনেক চেষ্টার পরেও ৯/১১-এর সাথে সংশ্লিষ্টতার স্বীকারোক্তি আদায় করতে না পেরে এদের মধ্যে ৪২০ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। মে ২০০৮ পর্যন্ত আনুমানিক ২৭০ জন যুদ্ধ বন্দী এই ক্যাম্পে আটকাবস্থায় দিনাতিপাত করছে। পেন্টাগন বলছে (ফেব্রুয়ারী ৯, ২০০৮), এদের মধ্যে মাত্র ৬ জনকে ৯/১১ এর সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে বিচার করা হবে। তারা আশা করেছিল এ সংখ্যা ৬০ থেকে ৮০তে দাঁড়াবে। এটা যেন ঠিক ‘স্যাম্পল থিউরী (Sample Theory)’-র ম্যাস (mass) প্রোডাক্টশনের ব্যাচ থেকে এক্সপেরিমেন্টের জন্য কিছু সিলেকশন অথবা জন্তু-জানোয়ারের পাল থেকে বেছে বেছে তরতাজা কয়েকটা পশু ধরে কুরবানীর জন্য নিয়ে আসার মত random selection।

এই হতভাগা মজলুম বনি-আদমদের মুখ দিয়ে জোর করে কথা বের করে আনার জন্য যে বর্বর পদ্ধতিসমূহ প্রয়োগ করা হয়েছে বা এখনো হচ্ছে তা বর্ণনা করলে যে কোন মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠবে। তার একটি হল ‘স্লিপ ডিপ্রাইভেশন (Sleep Deprivation)’ বা ‘নিদ্রা-প্রবঞ্চণা’। হেরাল্ড ট্রিবিউন জুলাই ২, ২০০৭ এ লিখেছে, এই পদ্ধতিটি তারা চীনা কমিউনিস্টদের কৌশল থেকে নকল করেছে যারা কিনা কোরিয়ান যুদ্ধের সময় প্রয়োগ করত। এ পদ্ধতিতে কাউকে নিদ্রা থেকে একাধারে অনেকদিন বঞ্চিত রেখে ঘুমুতে দিয়েই হঠাৎ জাগিয়ে তুলে আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। ইসরাইলের সাবেক প্রধাণমন্ত্রী (১৯৭৭-১৯৮৩) মেনাসেম বেগিন (Menachem Begin) রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেজিবি’ কর্তৃক তার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘ক্রমাগত নিদ্রাহীনতার কারনে মাথার ভিতরে এক ধরণের কুঞ্ঝঘটিকা বা এলোমেলোভাব সৃষ্টি হয়। মন-প্রাণ ক্লান্তিতে বিষে যায়, পা দুটো মনে হয় শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন। তখন জীবনে একটাই চাওয়া থাকে, তা হল ‘ঘুম’।‘ তিনি বলেছেন, ‘যার অভিজ্ঞতা আছে কেবলমাত্র সেই-ই বলতে পারবে, এর সাথে ক্ষুধা বা তৃষ্ণার কোন তুলনা চলেনা। অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল একে চিহ্নিত করেছে ‘বর্বর’, ‘অমানবিক’ ও ‘মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপমানজনক’ পদ্ধতি হিসেবে।

‘ওয়াটারবোর্ডিং (Waterboarding)’ হল আরেকটি নির্যাতনের পদ্ধতির নাম। এই পদ্ধতিতে হাত-পা বেঁধে শুইয়ে মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কাপড় দিয়ে ঢেকে মাথা কাত করে উপর দিক থেকে পানি ঢালা হয়। নির্যাতিত মানুষটি নিঃশ্বাস বন্ধে ছটফট করতে থাকে, ভাবে পানিতে ডুবে বুঝি এখনই তার মৃত্যু হবে। এভাবেই চলতে থাকে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে ‘ইন্টারোগেশন’! বাহ্যত. শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন না থাকায় এই পদ্ধতিটি আমেরিকান সৈন্যদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়, যদিও এর প্রভাবে শরীরে প্রচন্ড ব্যথা, মস্তিস্ক ও ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতিসহ বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টায় হাত-পা ও শরীর প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত হওয়ায় হাড়-গোড় ভেঙে যাওয়া এমনকি মৃত্যুর সম্ভাবনাও রয়েছে। ২০০৭ সালে প্রথম প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, নিয়মিত বিচারের আওতায় না এনে সি.আই.এ এই পদ্ধতিটি তিনজন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী (খালেদ শেখ মোহাম্মদ, আবু যুবায়দা ও আব্দাল রাহিম আল নাশরী)-এর উপর প্রয়োগ করে আসছে। আর এই জঘন্য পদ্ধতিটি কিনা অনুমোদন করেছিল আমেরিকার খোদ ‘জাস্টিস্‌ ডিপার্টমেন্ট’! অবশ্য, উচচ আদালত এতদিনে তাদেরকে ‘যুদ্ধবন্দী’ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার কথা বলছে।
এতসব নির্যাতন সইতে না পেরে এ পর্যন্ত চারজন জনম-দুঃখীর আত্মহত্যার খবর দুনিয়ার মানুষ জানতে পেরেছে। পাশাপাশি পত্রিকায় এসেছে শত শত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার খবরও। বিচারের আগেই খেতাবপ্রাপ্ত এসব সন্ত্রাসী বন্দীদের কাছে দুনিয়ার জীবন বুঝি আর শেষ হতে চায় না। এরা বুঝি এখন আর মানুষ নয়! তিনজন বন্দীর মরা লাশ পাওয়া গেছে জুন ১০, ২০০৬-এ। আমেরিকার সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগণ বলেছে, ‘আমাদের (অর্থাৎ আমেরিকানদের) উপর অপরাধ চালানোর অনূশোচনা থেকেই তাদের এসব আত্মহত্যা!’ একেই বলে সভ্যতার চরম অপমান, মানবতার বুক ফাঁটা ক্রন্দন!

কানাডার নাগরিক তরুন যুবক ওমর খাদরের উপর নিদ্রা-প্রবঞ্চণা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন প্রকারের অত্যাচার চালনা হয়েছে উক্ত নরক শিবিরে। আফগানিস্তানে এক আমেরিকান সৈন্য হত্যার অভিযোগ তাকে ধরে আনা হয় ২০০২ সালে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। গত ১৫ জুলাই ২০০৮ এ তার আইনজীবি ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে ধারণ করা ইন্টারোগেশনের ভিডিও টেপ প্রকাশ করেছেন । উদ্দেশ্য হল, কানাডিয়ানদের সহানুভূতি জাগ্রত করা যাতে করে কানাডিয়ান সরকার গুয়ান্তেমো বে’র বন্দীশালা থেকে ওমরকে তার নিজ দেশে ফেরৎ এনে স্বদেশের আইনে সোপর্দ করে। এতে দেখানো হয়, ছেলেটির গগণবিদারী চিৎকারে পাষন্ডদের হৃদয় এতটুকুও টলেনি। ওমরের মায়ের বুক চাপড়ানোর দৃশ্য টিভিতে দেখলে কেউই চোখের পানি আটকিয়ে রাখতে পারবে না।

ভিডিও ফুটেজে দেখানো হয়েছে, ওমর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কানাডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার এক এজেন্টকে বলছে, ‘হয় আমাকে বাঁচাও, নয়তো মেরে ফেলো (Kill me or Help me)’। ‘নিদ্রা-প্রবঞ্চণা’ তাকে এমনভাবে শেষ করে ফেলছে যে, সে বাস্পরুদ্ধ কন্ঠে করে বলে যাচ্ছে, ‘আমার হাত নাই, পা নাই চোখ নাই’। সাক্ষাৎকার নেয়া কর্মকর্তা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘না, তোমার তো সবই আছে। এই যে তোমার হাত, ওই হল তোমার পা, তোমার চোখ, সবই আছে’। ওমর বলছে, ‘না আমার কিচ্ছু নাই, তোমরা আমায় যত্ন নিচ্ছ না, তোমরা আমাকে মেরে ফেলো, না হয় বাঁচাও’। চিৎকার করে সে তার মাকে ডাকছে ‘ইয়া উম্মী’, ‘ইয়া উম্মী (মা, আমার মা)’। তার মা মাহা আল-সামনাহ্‌ পরদিন (জুলাই ১৬, ২০০৮) সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ছেলে আমাকে ডাকছে, আর আমি এখানে বসে আছি। আমি আর পারছি না।‘ তিনি বলেন, ‘আমি কাঁদছি। খোদা, এখানে বসে বসে তাকে ডাকা ছাড়া আমি কিইবা করতে পারি। আহ্, আমার ছেলে যদি আমার আমার উত্তর শুনত! খোদা, তুমিই তার ডাকের উত্তর দাও।‘

আরেকজন বন্দীর নাম ত্রিশ বছর বয়স্ক সেলিম হামদান। নভেম্বর ২০০১-এ আফগানিস্তান থেকে ধরে এনে ৬ বছর ধরে ওই ক্যাম্পে সব ধরনের নির্যাতন চালানো হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, বিন লাদেনের ট্রাক ড্রাইভার ও আল-ক্বায়েদার সদস্য, যদিও সে এসব অস্বীকার করছে। ইউএস সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক যুদ্ধবন্দীদের সাংবিধানিক অধিকার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক রুলিং জারির পর জুলাই ১৬, ২০০৮ এ তাকে নিয়মিত আইনের আওতায় এনে শুনানী শুরু করা হয়। আদালতে সে বর্ণনা করেছে, কিভাবে ৫০ দিন ধরে তার উপর নির্যাতনের বিভিন্ন পদ্ধতি যেমন, নিদ্রা-প্রবঞ্চণা, যৌন নিপীড়িনসহ নানা ধরনের অত্যাচার করা হত। শ্রান্ত-ক্লান্ত শরীর ঘুমের জন্য এলিয়ে দেয়ার পাঁচ-দশ মিনিটের মাথায়ই দরজায় কান ফাটানো আওয়াজ দিয়ে উঠিয়ে আবার শুরু হত জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের প্রচেষ্টা। সেলিমের আইনজীবি গত ২১ জুলাই মার্কিন আদালতে বলছে, ‘তার মক্কেল আল-ক্বায়েদার সদস্য নয়, কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথেও জড়িত নয়। নিজের বড়সড় পরিবারটি চালাতে সে মাসিক দুইশো ডলারের বিনিময়ে ছিল একজন লো-লেভেলের ট্রাক ড্রাইভার’। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইয়েমেনী নাগরিক সেলিম হামদানই প্রথম যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অপরাধের অভিযোগে বিচার চলছে । অনুমান করা হচ্ছে, ওমর খাদর হবে এদিক থেকে দ্বিতীয়। অক্টোবরে তার শুনানী শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।



উপসংহারে বলা যায়, যেকোন সন্ত্রাসী, দূর্নীতিবাজ বা দুস্কৃতিকারীদেরকে তড়িঘড়ি করে ধরে এনে নিয়মিত বিচারের সম্মুখীন করে তাদের সর্বোচচ সাজা নিশ্চিত করাতে যেকোন সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। সবারই কাম্যও তাই। এতে করে একটি দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত হয়। সাথে সত্যিকারের অপরাধীরাও দূর্বল হয়। তাছাড়া, কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরিকে কাউকেই সন্ত্রাসী বা দাগী আসামী আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ অনুমানের উপর ভিত্তি করে অকথ্য নির্যাতন চালানো পৃথিবীর কোন দেশের আইনই অনুমোদন করেনা। ক্ষমতা থাকলে কাউকে ধরে এনে চোখ, মুখ বেঁধে পিটিয়ে হাড়-গোড় ভেঙে নির্যাতন চালানো অত্যন্ত সহজ কাজ, এটা নিশ্চয়ই কোন কৃতিত্বের কাজ নয়। আর আন্তর্জাতিক বিধি মোতাবেক প্রতিটি দেশের সংবিধানই বন্দীসহ যেকোন মানুষের ন্যায্য প্রাপ্য নাগরিক-অধিকার পাওয়ার যোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। ন্যায়দন্ড সমুন্নত রাখাই অন্ততপক্ষে ক্ষমতাবানদের ব্রত হওয়া উচিৎ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পূর্বে কম্যুনিস্টরা যুদ্ধবন্দীদের উপর এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করত আর দেশ হিসেবে আমেরিকা যুক্তরাস্ট্র ছিল এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী সোচচার। আর আজ তারাই ওই পদ্ধতিগুলো কমুনিস্টদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শিখে উলটো ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বানিয়ে বন্দীদের উপর হুবহু প্রয়োগ করতে এখন লজ্জা পাচ্ছে না।